ফিচার

ঘোড়ায় চড়ে প্রায় ৩ হাজার কবর খনন করেন মনু মিয়া

মো: নূরে আলম: কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় মনু মিয়া নামে এক বৃদ্ধ মানুষ ঘোড়ায় চড়ে কবর খোঁড়ার জন্য বিখ্যাত। ৭০ বছর বয়সী এই মানুষ গত ৫০ বছর ধরে এই অনন্য কাজ করে আসছেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩ হাজার কবর খনন করেছেন।

মনু মিয়া ইটনা উপজেলার জয়সিদ্দি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ছোটবেলা থেকেই ঘোড়ায় চড়তে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৭২ সালে একদিন তার গ্রামের এক বৃদ্ধ মারা যান। কবর খোঁড়ার জন্য লোকজন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছিল। তখন মনু মিয়া তার ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত কবর খুঁড়ে দেন। এই ঘটনার পর থেকে তিনি এলাকায় কবর খোঁড়ার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

মনু মিয়া বলেন, “আমি যখন শুনি এলাকায় কেউ মারা গেছে, তখন দ্রুত ঘোড়ায় চড়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে যাই। কবর খোঁড়ার জন্য আমি কোনো পারিশ্রমিক নিই না।”

মনু মিয়ার এই নিরলস সেবায় এলাকাবাসী কৃতজ্ঞ। তারা তাকে ‘শেষ ঠিকানার কারিগর‘ বলে অভিহিত করে।

মনু মিয়ার কবর খোঁড়ার প্রক্রিয়া:

* মৃত ব্যক্তির বাড়িতে পৌঁছানোর পর মনু মিয়া প্রথমে কবরের জন্য স্থান নির্বাচন করেন।
* তারপর তিনি তার খুন্তি-কোদাল, দা, চাকু, স্কেল আর করাত দিয়ে কবর খনন শুরু করেন।
* সাধারণত তিনি এক ঘন্টার মধ্যে একটি কবর খনন শেষ করে ফেলেন।
* কবর খোঁড়ার পর তিনি মৃত ব্যক্তির দাফনের প্রস্তুতি নেন।
* দাফন শেষে তিনি মৃত ব্যক্তির পরিবারের কাছে বিদায় নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বাড়ির পথে রওনা হন।

মনু মিয়ার জীবন:
মনু মিয়ার স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, বিয়ের পর প্রথমে উনি যখন এই কাজে যেতেন তখন খুব একটা ভালো লাগত না। এ জন্য নিষেধও করেছি বেশ কয়েকবার। আমার নিষেধ উনি শোনেননি। সকালে কার কবর খুঁড়বেন এই চিন্তা নিয়ে ঘুমান। রাতভর তার ভালো ঘুম হয় না। সারারাত অপেক্ষায় থাকেন কখন সকাল হবে।

আরও পড়ুনঃ  মিরপুরের রূপান্তর: মেট্রোরেলের অভূতপূর্ব প্রভাব

রহিমা বলেন, একপর্যায়ে তার দেখাদেখি আমিও মৃত ব্যক্তির গোসল করানো শুরু করে দিই। ওনার মতো আমি তো গ্রামের বাইরে যেতে পারি না। তবে গ্রামের ভেতরে কোনো মহিলা মারা গেলে আমি গিয়ে গোসল করাই। মনু মিয়া বলেন, ১৯৭২ সালে আমার মা মারা যান। তখন দেখলাম গ্রামের লোকজন খুবই দায়িত্ব নিয়ে আমার মায়ের কবরটা খুঁড়তেছে। এই জিনিসটা দেখে আমিও তাদের সঙ্গে কাজে নেমে যাই। সেই তখন থেকেই শুরু।

মনু মিয়ার জীবনে আক্ষেপ বাবার মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছিলেন ১৫ দিন পর। তিনি বলেন, আমার জীবনে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ একটাই, সেটা হলো আমার বাবার মৃত্যুর খবর আমি ১৫ দিন পরে পেয়েছি। কবরও খুঁড়তে পারিনি!

মনু মিয়া বলেন, তখন আমি ঢাকা শহরের নূরেরচালা এলাকায় আমার ভায়রার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। আর সেই বাসাও কেউ চিনত না। এ ছাড়া তখন কারও মোবাইল ছিল না। ঢাকায় গিয়ে আমি ২০ দিন ছিলাম। বাড়ি থেকে যাওয়ার পাঁচ দিন পরই বাবা মারা যান। আর সেই খবর আমি পেয়েছি মৃত্যুর ১৫ দিন পরে।

মনু মিয়ার ভাতিজা নিকলু মিয়া বলেন, মৃত ব্যক্তির বাড়ি থেকে ফিরেই তিনি সর্বপ্রথম গোসলটা সেরে নেন। তারপর খাওয়া-দাওয়া না করে আগে দেখবেন লিখতে পারে এমন কেউ আশপাশে আছে কি না। এরপর যাকে পাবেন তাকে দিয়েই ছোট টুকরা কাগজের লেখাটা তুলবেন মূল ডায়েরিতে।

তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তির নাম-ঠিকানা আর মৃত্যুর তারিখ লেখানোর পর খেতে বসবেন তিনি। এমন মানুষ আছে যারা নিজেদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর তারিখ ভুলে গেছেন। তারাও অনেক সময় আসেন তারিখ নিতে। কোথাও কেউ মারা গেলেই ফোন চলে আসে। কাজ না থাকলে গ্রামের বাজারে বসে সময় পার করি। অনেক সময় ফোন আসা ছাড়াও লোকমুখে শুনেও রওনা দিই।

সর্বশেষ মনু মিয়া জানান, বাবার রেখে যাওয়া কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে একটি ঘোড়া কিনেছেন। ওই ঘোড়ার পিঠে চড়েই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলের এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে চলেন তিনি। তবে শহর অঞ্চলে গেলে ঘোড়া বাড়িতে রেখে যান।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *